
copyright protected....
*
কলেজের গ্র্যাজুয়েশন উৎসবের কোলাহল, রঙিন আলোর রোশনাই আর জিসানের সেই উজ্জ্বল, প্রেমপূর্ণ চোখ—সবকিছুই এখন স্কারলেটের কাছে দূর অতীতের ঝাপসা স্মৃতির মতো মনে হচ্ছে। ডুলিন গ্রামের চেনা রাস্তা ধরে সে যখন ক্লিফসের দিকে হাঁটছিল, তার বুকের ভেতরটা যেন আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। পায়ে কোনো জোর নেই, তবুও এক অদৃশ্য টানে সে এগিয়ে যাচ্ছিল সেই খাড়া পাথুরে পাহাড়ের প্রান্তের দিকে, যেখানে এসে পৃথিবীটা শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হয়।সে এসে দাঁড়াল ক্লিফসের ঠিক চূড়ায়। এখানে আয়ারল্যান্ডের এই বিশাল পাথুরে দেওয়াল সোজা ৭০০ ফুট নিচে গিয়ে আছড়ে পড়েছে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে। আজ প্রকৃতি যেন স্কারলেটের মনের ভাঙা অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে রুদ্ররূপ ধারণ করেছে।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, কিন্তু কুয়াশা আর মেঘের চাদরে আকাশ এমনভাবে ঢাকা যে মনে হচ্ছে দিন শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখানের বাতাস সাধারণ নয়, এ যেন এক ক্ষ্যাপাটে দৈত্যের গর্জন। সমুদ্র থেকে আসা নোনা ও কনকনে ঠান্ডা বাতাস স্কারলেটের মুখে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে। সেই বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকাটাই দায়। ক্লিফসের ওপরে সবুজ ঘাসের গালিচা বাতাসের চাপে মাটির সাথে মিশে আছে। দূরে ও'ব্রায়েন্স টাওয়ারটা কুয়াশার আড়ালে এক নিঃসঙ্গ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।সবচেয়ে ভয়ার্ত শব্দটা আসছে নিচ থেকে—আটলান্টিকের গর্জন। শত শত ফুট নিচে, কালচে নীল জলের বিশাল বিশাল ঢেউ পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছে। সেই শব্দ এত প্রবল যে, মনে হচ্ছে যেন হাজারটা কামান একসাথে দাগা হচ্ছে। ঢেউগুলো পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে সাদা ফেনায় পরিণত হচ্ছে, আর সেই ফেনার ছিটেফোঁটা বাতাস বয়ে নিয়ে আসছে ওপরে, স্কারলেটের মুখে। সেই নোনা জল আর তার চোখের জল মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।স্কারলেটের পরনে ছিল তার গ্র্যাজুয়েশনের দিনের জন্য বেছে নেওয়া সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি—একটি ডিপ মেরুন রঙের মখমলের (Velvet) লং ড্রেস। ড্রেসটির হাতাগুলো কব্জি পর্যন্ত লম্বা, এবং কোমরে একটি পাতলা সোনালী বেল্ট। অনেক দিন থেকে অল্প অল্প টাকা জমিয়ে স্কারলেট কিনেছিলো জামাটি!সে ভেবেছিল, এই পোশাকে জিসানকে যখন সে তার মনের কথা বলবে, জিসান মুগ্ধ হয়ে তাকাবে। কিন্তু এখন সেই মখমলের ড্রেস কনকনে বাতাসের ঝাপটায় তার শরীরের সাথে লেপটে আছে। ঠান্ডায় তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। তার ফর্সা হাতের আঙুলগুলো নীল হয়ে গেছে, পায়ের পাতা অসাড়। উৎসবের জন্য করা হালকা মেকআপ বৃষ্টির ছাট আর চোখের জলে ধুয়ে তার ফোলা গালে কালচে দাগ তৈরি করেছে। তার সিল্কি লাল চুলগুলো বাতাসের দাপটে পাগলের মতো উড়ছে, বারে বারে মুখের ওপর এসে পড়ছে, হড়িনের মতো চোখদুটো আড়াল করে দিচ্ছে চুলের গোছা...।তার পায়ে হিল জুতো, যা সে ক্লিফসের রাস্তায় আসার সময় অনেক আগেই কোথায় খুলে এসেছে জানা নেই.. । এখন তার খালি পা সেই ধারালো, ঠান্ডা জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সে কোনো ব্যথা অনুভব করছে না। মনের ভেতরের ব্যথার কাছে শরীরের এই কষ্ট তুচ্ছ। স্কারলেটের ভেতরের জগতটা সম্পূর্ণ নিঃশব্দ, মৃত। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে জিসানের সেই লাজুক হাসি, যখন সে তার প্রেমিকার হাত ধরেছিল। "আমি ওকে ভালোবাসি, স্কারলেট"—এই কটা কথা যেন তার কানে বারবার মন্ত্রের মতো বাজছে। ছোটবেলা থেকে বুনে আসা সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত পরিকল্পনা এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে গেছে। তার মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে সে সম্পূর্ণ একা, অপ্রয়োজনীয়। জিসান ছাড়া এই সুন্দর পৃথিবীটা তার কাছে এক বিষাক্ত মরুভূমি। কেউ নেই তার জিসান ছাড়া এটাতো চরম সত্যি কথা.. ছোট থেকে তার অদ্ভুত দুই রকম চোখের মনির জন্য অনাথ আশ্রমে কেউ তার সাথে মিশত না একমাত্র জিসান বাদে, তাই তো সেই একমাত্র স্কারলেটের গোটা জগৎ হয়ে গেছিলো, যেই জগত শুধু স্কারলেটের একার সেই জগতে অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির প্রবেশ কিভাবে মেনে নেবে স্কারলেট, স্কারলেটের সেই জগৎ যখন আর নেই তার জীবনের কোনো মানে নেই, তার মনে কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধা নেই। আছে শুধু এক গভীর, অসহ্য যন্ত্রণা যা থেকে সে মুক্তি চায়। এই গর্জনরত সমুদ্র, এই অতল গভীরতা যেন তাকে ডাকছে—তার সমস্ত যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিতে।
সে আরেক পা এগিয়ে গেল একদম প্রান্তের দিকে। হুট করে মনে হলো স্কারলেটের বুকের ভেতর থেকে ডেকে উঠছে জিসান কে কেন্দ্র করে... " আমাকে বাচা জিসান, আমি তোর সাথে বাচতে চাই! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে.. আমি! আমি বাচবো না, দেখ আজকে আমি মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আছি! কেউ আসছে না আমাকে বাচাতে, কেউ নেই আমার, আমার মৃত্যু তে কেউ কাদবে না,একমাত্র তুই ছাড়া, প্লিজ জিসান... কেউ নেই আমার! তুই আছিস.. "
স্কারলেটের পায়ের নিচে কিছু আলগা পাথর হুড়মুড় করে নিচে পড়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করল। বাতাসের গর্জন আরও বেড়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য জিসানের মুখটা তার মনে ভেসে উঠল—শেষবারের মতো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, স্কারলেট তার দুহাত দুপাশে প্রসারিত করল, যেন সে ডানা মেলছে। তার মেরুন ড্রেসটা বাতাসের চাপে পেছনের দিকে ফুলে উঠল।
আর তারপর... সে ঝাঁপ দিল।
বাতাসের গতি এক মুহূর্তে থেমে গেল বলে মনে হল। সে সোজা নিচে পড়ছে। তার মেরুন ড্রেসটা আগুনের শিখার মতো তার চারপাশে উড়ছে। বাতাস তার কান দিয়ে সাঁই সাঁই শব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে। নিচের সেই রুদ্ররূপী সমুদ্র দ্রুত তার দিকে এগিয়ে আসছে। পাহাড়ের গায়ের খাড়া পাথরগুলো তার চোখের সামনে দিয়ে তীরের মতো ওপরে উঠে যাচ্ছে।
সে পড়ছে... মুক্ত, নিঃসঙ্গ, এবং সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে।
তার ভাঙা মন, তার অসাড় শরীর, জিসানের সাথে কাটানো এতো গুলো বছর এর স্মৃতি আর তার মখমলের ড্রেস—সবকিছু নিয়ে স্কারলেট আটলান্টিকের সেই গর্জনরত, বরফশীতল কালচে নীল জলের দিকে আছড়ে পড়ছে। আর ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে, এক নিঃসঙ্গ মেরুন ছায়া যেন প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সাথে মিশে যাচ্ছে।হঠাৎ সমুদ্রের সমস্ত গর্জন থামিয়ে দিয়ে, অসীম গভীরতা থেকে এক আশ্চর্য সুর ভেসে এল। সেই সুরের বর্ণনার ভাষা কোনো মানবী ভাষায় সম্ভব নয়। তা যেন কোনো প্রাচীন বাঁশির করুণ রাগিনী, আবার একই সাথে গভীর জলপ্রপাতের মৃদু গুঞ্জন। সুরটি স্কারলেটের অবচেতন মস্তিষ্কে কোনো জাদুবলে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। যেন সেই গান তাকে বলছে কিছু স্কারলেটের ভারী হয়ে আসা চোখের পাতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে সে অনুভবে পেল, জলের জমাট ঠান্ডাভাব এক নিমেষে দূর হয়ে গেছে। এক অভূতপূর্ব উষ্ণতা তার অবশ শরীরকে ঘিরে ধরেছে। দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী, সুগঠিত বাহু তার কোমর আর পিঠের নিচে এসে তাকে আলতো করে তুলে নিল। অচেতন স্কারলেটের অবিন্যস্ত লাল চুল সমুদ্রের জলে ভাসছিল; সেই রহস্যময় সত্তা স্কারলেটের মুখে নেমে এসে নিজের ঠোঁট দুটি চেপে ধরল তার ঠোঁটে।সেটি কেবল ভালোবাসার চুম্বন ছিল না; সেটি ছিল গভীর সমুদ্রের প্রাচীন জীবনবায়ুর আদান-প্রদান। মায়াবী এক আলো স্কারলেটের ঠোঁটের ভেতরের দিকে প্রবাহিত হতেই তার ফুসফুসের সমস্ত নোনা জল নিমেষে বাষ্পীভূত হয়ে গেল, দম বন্ধ হয়ে আসার যন্ত্রণা মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেল। স্কারলেট পুরোপুরি চেতনার বাইরে চলে গেল, কিন্তু তার ঠোঁটে লেগে রইল এক অলৌকিক স্নিগ্ধ স্পর্শ।
চলবে.....



Write a comment ...